Translate in Your Language

ব্লকচেইন শ্বেতপত্র । লেখকঃ আকিব জিলান রামিম

BlockChain Technology,Cryptography,ব্লকচেইন টেকনোলজি,ক্রিপ্টো কারেন্সী,ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড

এমন কি হতে পারে আপনি একদিন খুব ক্ষুধার্ত হয়ে রেস্টুরেন্টে গেলেন আর দুটো এভারেজ সাইজের পিজ্জা খেয়ে সারা জীবনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে রইলেন? ল্যাযলো হ্যানিয়েয নামের এক ব্যক্তি ২০১০ সালে মাত্র দুটি পিজ্জা ১০,০০০ বিটকয়েন দিয়ে কিনে খেয়েছিলেন।   আজ আপনি মোটামুটি  ১ বিটকয়েন দিয়েই একটা টেসলা ৩ মডেলের কার ফুল সেল্ফ ড্রাইভিং এক্সটেনশনসহ কিনতে পারবেন। অবশ্য তা করা ঠিক হবে কিনা কে জানে, ল্যাযলো এখন বলছেন তিনি  বিটকয়েন দিয়ে একটা টেসলা  কিনে একই ভুল দ্বিতীয়বার আউড়াবেন না! 


তবে বিটকয়েন যিনি তৈরি করেছিলেন সাতোশি নাকামোতো ( তিনি কে তা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না! )  তিনি এটি হাতে জমা রেখে বড়লোক হওয়ার জন্য তৈরি করেননি।   বিটকয়েন একটি অনলাইন ভিত্তিক ক্রিপটোকারেন্সি যা অন্য  মুদ্রার মতোই দৈনিক লেনদেনের জন্যই তৈরি করা করা হয়েছিল। আর এটি যে টেকনলোজির উপর প্রতিষ্ঠিত তা  হল ব্লকচেইন টেকনোলোজি। বিটকয়েনকে কোনো ক্যাসিনোর চিপ বা টোকেন বলা যায়,  আর ব্লকচেইন হল সেই ক্যাসিনোটাই।


তাহলে কি এই ব্লকচেইন ? আর কিভাবে এটি কাজ করে? 

ব্লকচেইন মূলত ট্রান্সেকশন (অনলাইনে অর্থ/সম্পদ আদানপ্রাদান ) রেকর্ড   সংরক্ষণ ,  শেয়ার এবং ভেরিফাই  করার একটি  পদ্ধতি যাতে  তথ্য একক কোনো ব্যক্তি,  প্রতিষ্ঠান বা সেন্ট্রাল সার্ভারে না রেখে এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির কাছে স্টোর করে রাখা হয়।  আর এই তথ্যগুলো থাকে ব্লক আকারে, সময়ের সাথে সাথে নতুন ব্লকের সৃষ্টি হয় আর প্রতিটি ব্লক তার পূর্ববর্তী ব্লকের সাথে লিংকড অবস্থায় থাকে। যেহেতু তথ্য একক কোনো প্রতিষ্ঠানে জমা থাকে না তাই একে বিকেন্দ্রিত বা ডিসেন্ট্রালাইজড ডেটাবেজ বা লেজার বলা হয়।  আর ট্রান্সেকশন গুলো ব্লক আকারে এবং একটির সাথে আরেকটি চেইনের মতো যুক্ত থাকে তাই বলে একে বলা হয় ব্লকচেইন। 


ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রধান একটি বিশেষত্ব হল এটি অনলাইন ট্রান্সেকশনের জন্য একটি ট্রাস্টলেস পরিবেশ  তৈরি করে! আমরা যখন অনলাইনে কোনো পেমেন্ট করি তখন অবশ্যই আমরা কোনো না কোনো ব্যাংক বা  আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা আমাদের কক্ষিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট পাঠাই ।  এক্ষেত্রে আমাদের সকল তথ্য আগে থেকেই ব্যাংকের নিকট থাকে যা ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় KYC হিসেবে প্রদান করতে হয় , পাশাপাশি আমরা যাকে টাকা পাঠাবো তাদের KYC ও ঐ ব্যাংকের নিকট গচ্ছিত থাকে। আমরা বিশ্বাস করি যে  ব্যাংকের নিকট প্রাপকের যে KYC আছে তা সত্য এবং ব্যাংক আমাদের টাকাটি ঠিকমতো সঠিক জায়গায় প্রেরন করে দেবে পাশাপাশি এর যথাযথ রেকর্ড রাখবে যাতে অপর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে অস্বীকার বা পরিবর্তন  করতে না পারে ।  এর ফলে ব্যাংক কিছু টাকা ট্রান্সেকশন চার্জ হিসেবে কেটে নেয়।  কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের আর কোনো ব্যক্তি বা তৃতীয় কোনো পক্ষকে 'বিশ্বাস' করার প্রয়োজন পরবে না, এমনকি তাদের কোনো ব্যক্তিগত তথ্যই আমাদের প্রয়োজন হবে না । অর্থাৎ আমরা যদি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করি তবে আমাদের প্রতিটি ট্রান্সেকশন নেটওয়ার্কে যুক্ত অন্য সকল নোড (ব্যবহারকারী কম্পিউটার)  দ্বারা ভেরিফাই হবে এবং এরপর ব্লকচেইনে একেকটি ব্লক আকারে সময়ের ক্রমান্বয়ে যুক্ত হবে।  প্রাপক কখনোই এই ট্রান্সেকশন অস্বীকার বা এর কোনো সূক্ষ্মতম  পরিবর্তন করতে পারবে না।  কারন ব্লকচেইনের কোনো ব্লকে কেউ কোনো পরিবর্তন বা মুছে ফেলতে  চাইলে অন্য সকল নোড তা নিজেদের ডেটাবেসের সাথে মিলিয়ে দেখে,  যদি তাদের ডেটাবেসের সাথে শতভাগ মিল না পায় তবে সেই ব্লক সাথে সাথে বাতিল হয়ে যায়। যদি কোনো পরিবর্তন ব্লকচেইনের ৫১% নোড সমর্থন দেয় তবেই তা কার্যকর হবে যেটা সাধারন একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা অসম্ভব । যার ফলে হ্যাকার কখনোই ব্লকে আক্রমন করে তার তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলতে সমর্থ হয় না। প্রতিটি ব্লকের ট্রান্সেকশনের তথ্য এমনভাবে এনক্রিপট করে হ্যাশকোডে রুপান্তর করা হয় যাতে চাইলেই কেউ ট্রান্সেকশন দেখতে পারবে না অথচ সহজেই  ভেরিফাই করতে পারবে যে তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।   ভেরিফিকেশন ও একটি ব্লক নেটওয়ারর্কে যুক্ত করতে যারা সাহায্য করে তাদের বলা হয় মাইনার। তারা প্রতিটি ব্লক নেটওয়ার্কএ অর্থাৎ ডিসেন্ট্রালাইজড ডেটাবেজে যুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমান ক্রিপটোকারেন্সি (যেমন বিটকয়েন)  পারিশ্রমিক হিসেবে লাভ করে।  


বিটকয়েনের মতো আরো  চার হাজার খানেক ক্রিপ্টোকারেন্সি  ব্লকচেইনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে,  এর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ও ব্যবহৃত হল ইথেরিয়াম। এর অন্যতম সুবিধা হল এতে স্মার্ট কনট্রাক্ট পরিচালনা করা যায়, যাতে ট্রান্সেকশন ছাড়াও অন্য সব রকমের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব।  এই স্মার্ট কনট্রাক্ট মূলত Solidity প্রোগ্রামিং ভাষায় লেখা কিছু প্রোগ্রাম যা নিজে থেকেই প্রোগ্রামে দেওয়া শর্ত পুরন হলে ট্রান্সেকশন সম্পন্ন করে।  রোবোটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ ব্লকচেইন ও স্মার্ট কনট্রাক্ট  ব্যবহার করে অভূতপূর্ব  ফলাফল পাওয়া সম্ভব। 

ধরুন আমারা সকলে একটি ব্লকচেইনে যুক্ত আর প্রত্যেকে একটি করে স্মার্ট কনট্রাক্ট এর অধিকারী ।  আমরা প্রতিদিন যা ট্রান্সেকশন সম্পন্ন করি তার সবই ব্লকচেইন থেকে যায়।  আমাদের যদি রাইড শেয়ারিং এর প্রয়োজন হয় তাহলে রাইডারগণ আর উবার বা পাঠাওয়ের মতো মধ্যস্ততাকারীর উপর নির্ভর না করে নিজেদের স্মার্ট কনট্রাক্ট এর মাধ্যমে তাদের তথ্যগুলো যেমন মোট রাইড শেয়ার, রেটিং,  ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি ব্লকচেইনে  দিয়ে দিতে পারে।  এদিকে আমরাও আমাদের স্মার্ট কনট্রাক্ট ব্যবহার করে রাইড নিতে পারি ।  আমরা যদি চাই তাহলে আমরা ঠিক করে দিতে পারব আমাদের কেমন ড্রাইভার লাগবে,  ধরুন যাদের রেটিং ৪.৫ এর উপরে এবং যারা ১০০০+ ট্রিপ সম্পন্ন করেছে,  আবার আমাদের ট্রিপ শেষ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকাটা রাইডারের কাছে চলে যাবে যা ঠিক করা হবে স্মার্ট কনট্রাক্ট এর প্রোগ্রামিং এর ভিত্তিতেই,  যার ফলে রাইডারেরও প্রয়োজন হবে না আমাদের 'বিশ্বাস' করার! আর তবুও যদি কেউ টাকা না দেয় বা কোনো রাইডার খারাপ রেটিং পায় সেটা থেকে যাবে ব্লকচেইন এ।  যা আর কখনোই পরিবর্তন করা যাবে না সুতরাং পরবর্তীতে সকলে তার সাথে রাইড শেয়ারিং এ অনাগ্রহী হবে।


মূলত ব্যবসায়  বিশেষ করে সাপ্লাই চেইন এ ব্লকচেইন ও স্মার্ট কনট্রাক্ট এর ব্যবহার ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যপক। যেমনঃ  একটি পণ্য উৎপাদনের শুরু থেকে বিক্রয় পর্যন্ত সকল তথ্য যদি ব্লকচেইনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় তাহলে ক্রেতারা শুধুমাত্র একটি কিউ আর কোড  স্কান করেই জানতে পারবে পন্যটি আসল নাকি নকল, অথবা তিনি যেটা চাচ্ছেন এটি সেটাই কিনা। অথচ তাদের ভেতরের  কোনো কিছুই জানতে হবে না কারন এই সকল কাজ করবে ব্লকচেইন প্রযুক্তি।


একটি দেশের প্রায় প্রতিটি খাতে ব্লকচেইন ব্যবহার করে সেবার মান বৃদ্ধি, খরচ হ্রাস ও স্বচ্ছতা  সৃষ্টি করা সম্ভব। দেশের দূর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ব্লকচেইন হতে পারে একটি অন্যান্য হাতিয়ার।    

কিন্তু যেহেতু ব্লকচেইনে অর্থ প্রেরন করতে ব্যাংক বা ব্যক্তিগত তথ্য লাগে না তাই চাইলেই কেউ মন্দ কাজের উদ্দেশ্য অর্থ আদানপ্রদান বা বিদেশে অর্থ পাচার করতে পারে। ব্লকচেইন অত্যন্ত সিকিউরড হওয়ায় কোনো দেশের সরকারই তা ট্রাক করতে সক্ষম হয় না।  বর্তমানে পৃথিবীর ৬ টি দেশে ক্রিপটোকারেন্সির লেনদেন নিষিদ্ধ তার মধ্যে একটি হল বাংলাদেশ। বাকি দেশগুলো হলঃ আলজেরিয়া, বলিভিয়া,  ইকুয়েডর, নেপাল এবং মেসিডোনিয়া। 


তাহলে, যেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারই নিষিদ্ধ সেই দেশে বসে ব্লকচেইনের প্রয়োগ নিয়ে স্বপ্ন দেখা আসলে কতটা বাস্তবিক?  ব্লকচেইন একটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি যা হয়তো আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য  সুদুর ভবিষ্যতের বলে মনে হতে পারে কিন্তু আশার কথা হচ্ছে এরই মধ্য আমাদের দেশে বেসরকারিভাবে তো বটেই,  সরকারিভাবেও এর প্রয়োগ সাফল্যজনকভাবে শুরু হয়েছে। তবে  তার চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে প্রতিবছর হওয়া আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডএ বাংলাদেশ ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ৬ টি পুরস্কারের মধ্যে ২টিই দেশে নিয়ে এসেছে। আর বাংলাদেশের এই বিষ্ময়কর সাফল্যে আন্তর্জাতিকমন্ডল এবারের ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড এর হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশকেই! যা থেকে আমরা বুঝতে পারি অন্তত  মেধা মননের দিক থেকে আমরা মোটেও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রসারের লক্ষে বেশকিছু  উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ,  আইসিটি মন্ত্রনালয়ের অধীনে ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড পরিচালনা তারই একটি নমুনা। সরকারের পরিপূর্ণ সহযোগিতায়  অচীরেই আমরা  ব্লকচেইনের  ট্রাস্টলেস সমাজে প্রবেশ করব বলে অত্যন্ত  আশাবাদী।  আকিব জিলান রামিম সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং,কুয়েট


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

বিশেষ ছাড়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট কিনতে এখানে ক্লিক করুন!!

Shemanto Sharkar